২ কোটি বছর আগের গাছের ফসিল উটিতে বানর না চড়তে পারা বিরল গাছ

সবুজ ছোট ছোট পাতা। লম্বা শাখা-প্রশাখা। অর্নামেন্টাল গাছ হিসেবেই বেশি পরিচিত। পাতায় হাত দিতেই কারেন্ট শকের মতো অবস্থা!

২ কোটি বছর আগের গাছের ফসিল উটিতে বানর না চড়তে পারা বিরল গাছ

ছবির মতো সুন্দর শহর উটি। পাহাড়-পর্বতে ঘেরা এক শৈল শহর। ছিমছাম, সাজানো-গোছানো। নীলগিরি পর্বতের কোলে প্রায় আট হাজার ফুট উঁচুতে বৈচিত্র্যময় এক শহর। এক সময়ের টোডা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এ শহরে ব্রিটিশরা উপনিবেশ গড়ে। সুন্দর বাসোপযোগী আবহাওয়া নজর কাড়ে তাদের। ব্রিটিশরা বিতাড়িত হয়েছে দেড়শ বছরেরও বেশি সময় আগে। তবে পরতে পরতে তাদের চিহ্ন। উটির চা, চকলেট, স্থাপনা থেকে বোটানিক্যাল গার্ডেন পর্যন্ত ইংলিশদের রুচি, অভ্যাস, বাণিজ্য বিস্তৃত এখনো।

প্রযুক্তির সহায়তায় এখন কোনো স্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যায় ভ্রমণের আগেই। দিল্লি থেকে উটি যাত্রা মানেই তীব্র রোদ থেকে এসি রুমে ঢোকার মতো। নেট ঘেঁটে জানা যায়, ঠান্ডা আবহাওয়ার এ শহরে অনেক বৈচিত্র্যের পাশাপাশি রয়েছে একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন। যেখানে আবার অনেক দুর্লভ বৃক্ষের পাশাপাশি রয়েছে দুটি মাঙ্কি পাজল ট্রি (বানর বিভ্রান্ত হওয়া গাছ) ও দুই কোটি বছর আগের একটি গাছের জীবাশ্ম (ফসিল)।

আমাদের গাইডও ঠিকঠাক জানেন না এ খবর। তাই উটি শহর থেকে চার কিলোমিটার দূরের পাহাড়ি এ বোটানিক্যাল গার্ডেনে ঢুকেও চেনা যাচ্ছিল না মাঙ্কি পাজল ট্রি। পরে তিনি স্থানীয়দের কাছে শুনে নিয়ে গেলেন গাছের কাছে। ছবির মতো স্বচ্ছ, সুন্দর গার্ডেনে মিনিট দশেক হাঁটার পরই দেখা গেলো বানর বিভ্রান্ত হওয়া সেই আকর্ষণীয় গাছ। বানর চড়তে পারে না এমন গাছ পৃথিবীতে খুব কমই আছে। অনেক কাঁটাযুক্ত গাছেও তারা দিব্যি উঠে যায়। তাহলে কী এমন আছে এই গাছে যে বানর চড়তেই পারে না। বিষয়টি স্বচক্ষে দেখতে উদগ্রীব ছিল সবাই।

সবুজ ছোট ছোট পাতা। লম্বা শাখা-প্রশাখা। অর্নামেন্টাল গাছ হিসেবেই বেশি পরিচিত। পাতায় হাত দিতেই কারেন্ট শকের মতো অবস্থা! দেখতে সুন্দর হলেও পাতা তীক্ষ্ণ ও সূচালো। তবে দেখে বোঝার উপায় নেই। হাত দিতেই বোঝা গেলো কেন বানর উঠতে পারে না, বা বিভ্রান্ত হয়। লাতিন আমেরিকার দেশ চিলি গাছটির অরিজিন। ১৭৮০ সালে সেখানে আবিষ্কৃত হয়। চিলি পাইন নামেও গাছটি পরিচিত। বোটানিক্যাল নাম অ্যারাউকারিয়া অ্যারাউকানা।

গাছটি দীর্ঘজীবী। বাঁচে সাতশ বছরের বেশি। তাই একে জীবন্ত জীবাশ্মও বলে। গার্ডেনের দ্বিতীয় গাছটি একটু নিচু ঢালে। লম্বা গাছটি শতবর্ষী। গাছ দুটির আশপাশে ঘুরে, পর্যবেক্ষণ করে কাঁটার মতো পাতা ছাড়া বানর না উঠতে পারার আর কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া গেলো না।

উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়, ১৮৫০ সালের দিকে গাছটি ব্রিটেনে পরিচিতি পায়। প্রজাতিটি বাগানে খুব বিরল ও ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিল না। উইলিয়াম মোলসওয়ার্থ নামে একজন ব্যক্তি গাছটি তার বন্ধুদের দেখাতে নিয়ে যান। তাদের মধ্যে একজন বিখ্যাত ব্যারিস্টার চার্লস অস্টিন গাছটি দেখে মন্তব্য করেছিলেন, ‘এটি একটি বানরকে আরোহণ করতে ধাঁধায় ফেলবে। পরে সেখান থেকেই নামকরণ করা হয় মাঙ্কি পাজল ট্রি।

৫৫ একর পাহাড়ি জায়গার ওপর ১৮৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বোটানিক্যাল গার্ডেনটি তামিলনাড়ু সরকারের অধীনে পরিচালিত হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এখানকার উচ্চতা ২২শ থেকে ২৫শ মিটার। ব্রিটিশরা এ বাগানের নকশা করে সেখান থেকে কম দামে সবজি পাওয়ার জন্য। ব্রিটিশদের অধীনে কিছু ইউরোপিয়ান সেটেলার এই গার্ডেনে ছিল। বাগানের কিছু অংশ এখনো ইউরোপিয়ান দেশ ইতালির স্টাইলেই রয়ে গেছে। বর্তমানে এখানে প্রায় এক হাজার প্রজাতির বিভিন্ন গাছ, ফার্ন, ফুল, বনসাইসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ রয়েছে। রয়েছে বেশ কয়েকটি লন ও পুকুর।

বোটানিক্যাল গার্ডেনটির আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ দুই কোটি বছর আগের একটি গাছের কাণ্ডের ফসিল বা জীবাশ্ম। এত বছর আগের কোনো জীবাশ্ম সাধারণ মানুষের দেখার সুযোগ পৃথিবীর খুব কম দেশে আছে। এখানে সেটি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান দর্শনার্থীরা। তামিলনাড়ুর দক্ষিণের জেলা আরকটের তিরুভাক্কারাই ন্যাশনাল ফসিল পার্ক থেকে এটা এখানে আনা হয়।

অন্তত ঘণ্টা দুয়েক সময় পেলে গোটা বোটানিক্যাল গার্ডেন ভালোভাবে ঘুরে ফেলা সম্ভব। প্রতিদিন কয়েক হাজার দর্শনার্থী এখানে আসে। ঘুরে বের হওয়ার সময় গেটের কাছে পাবেন টোডা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তৈরি বিভিন্ন উপকরণ ও চা।

jagonews24